
বাঙালির প্রতিদিনের খাবারে ভাতের উপস্থিতি প্রায় অবিচ্ছেদ্য। ভাত রান্না করা সহজ মনে হলেও চালের ধরন, পানি ব্যবহারের পরিমাণ এবং রান্নার আঁচের মতো বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করে ভাতের স্বাদ ও গঠন। সামান্য ভুলে ভাত অতিরিক্ত নরম, আঠালো কিংবা নিচে পুড়ে যেতে পারে। তাই ঝরঝরে ও সুন্দরভাবে সেদ্ধ ভাত রান্না করতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
রান্নায় নতুন হোন কিংবা নিয়মিত ভাত রান্না করেন, কিছু সাধারণ ভুল এড়িয়ে চললে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। ভাত রান্নার সময় যে পাঁচটি বিষয়ে নজর দেবেন, সেগুলো জেনে নেওয়া যাক।
১. চাল ভালোভাবে না ধোয়া
ভাত রান্নার আগে চাল ধুয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চালের গায়ে থাকা অতিরিক্ত শ্বেতসার রান্নার সময় ভাতকে বেশি আঠালো করে তুলতে পারে। তাই চাল রান্নার আগে কয়েকবার পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া ভালো।
সাধারণত তিন থেকে চারবার চাল ধুলে গায়ের অতিরিক্ত শ্বেতসারের কিছুটা দূর হয়। তবে চালের ধরন অনুযায়ী ধোয়ার প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। পানি তুলনামূলক পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত চাল ধুয়ে নিতে পারেন। এতে ভাতের দানা আলাদা রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
তবে সব ধরনের ভাতের ক্ষেত্রে একই মাত্রায় ঝরঝরে ভাব প্রয়োজন হয় না। কিছু পদে, যেমন খিচুড়ি বা নির্দিষ্ট ধরনের ভাতে, কিছুটা আঠালো গঠনও কাঙ্ক্ষিত হতে পারে।
২. চাল ও পানির অনুপাত ঠিক না রাখা
চাল ধোয়ার পরও ভাত ঠিকমতো না হলে চাল ও পানির অনুপাতের দিকে নজর দিন। পানি বেশি হলে ভাত অতিরিক্ত নরম বা আঠালো হতে পারে। আবার পানি কম হলে চাল পুরোপুরি সেদ্ধ না-ও হতে পারে।
চালের ধরন, বয়স, দানার আকার এবং রান্নার পদ্ধতি অনুযায়ী পানির প্রয়োজন বদলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু লম্বা দানার চাল রান্নায় এক কাপ চালের বিপরীতে দুই কাপ পানি ব্যবহার করা হয়। তবে এই অনুপাত সব চালের জন্য প্রযোজ্য নয়। ছোট দানার চাল কিংবা অন্য জাতের চালে পানির পরিমাণ আলাদা হতে পারে।
তাই প্যাকেটের নির্দেশনা থাকলে তা অনুসরণ করুন। অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পানি মেপে ব্যবহার করুন এবং প্রথমবার কোনো নতুন জাতের চাল রান্না করলে অল্প পরিমাণে পরীক্ষা করে নিতে পারেন।
৩. সাদা ও লাল চাল একইভাবে রান্না করা
সাদা ও লাল চালের রান্নার সময় এবং পানির চাহিদায় পার্থক্য রয়েছে। সাদা চালের তুলনায় লাল চালের বাইরের স্তরে আঁশ বেশি থাকে। এ কারণে লাল চাল সাধারণত সেদ্ধ হতে বেশি সময় নেয় এবং বেশি পানির প্রয়োজন হতে পারে।
সাদা চালের ক্ষেত্রে প্রায় ১৫ মিনিট রান্না যথেষ্ট হতে পারে, তবে চালের জাত ও পদ্ধতি অনুযায়ী সময় কমবেশি হয়। অন্যদিকে, লাল চাল সেদ্ধ হতে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ মিনিট বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
লাল চাল রান্নার সময় সাদা চালের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে অর্ধেক বেশি পানি লাগতে পারে বলে কিছু নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়। তবে নির্দিষ্ট অনুপাত চালের ধরন ও রান্নার পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। তাই শুধু সময় বা পানির পরিমাণের হিসাব না করে চালের দানা সেদ্ধ হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করুন। কিছু লাল চাল আগে থেকে ভিজিয়ে রাখলে রান্নার সময় কমতে পারে।
৪. বেশি আঁচে রান্না করা
ভাত দ্রুত রান্না করতে বেশি আঁচ ব্যবহার করলে সব সময় ভালো ফল পাওয়া যায় না। বেশি আঁচে পানি দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে। এতে চাল পুরোপুরি সেদ্ধ হওয়ার আগেই ভাত হাঁড়ির নিচে লেগে যেতে বা পুড়ে যেতে পারে।
ভাত রান্নার একটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো প্রথমে পানি ফুটিয়ে নেওয়া। এরপর চাল দিয়ে পানি আবার ফুটতে শুরু করলে আঁচ কমিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রান্না করা। এতে পানি ধীরে ধীরে শোষিত হয় এবং চাল সমানভাবে সেদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়।
তবে সব ধরনের চাল একই পদ্ধতিতে রান্না করা হয় না। কিছু পদ্ধতিতে চাল ও পানি একসঙ্গে দিয়ে রান্না শুরু করা হয়। তাই চালের ধরন অনুযায়ী পদ্ধতি বেছে নেওয়া এবং রান্নার সময় পানি শুকিয়ে যাচ্ছে কি না, খেয়াল রাখা জরুরি।
৫. রান্না শেষে ভাত কিছুক্ষণ ঢেকে না রাখা
ভাত সেদ্ধ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশন না করে পাঁচ থেকে দশ মিনিট ঢেকে রেখে দেওয়া যেতে পারে। এই সময়ে হাঁড়ির ভেতরের অবশিষ্ট বাষ্প ভাতের দানায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আর্দ্রতা আরও সমানভাবে বণ্টিত হতে পারে এবং ভাতের গঠন ভালো থাকে।
রান্না শেষ হওয়ার পর চুলা বন্ধ করে হাঁড়ির ঢাকনা লাগিয়ে রাখুন। কিছুক্ষণ পর কাঁটাচামচ বা ভাত তোলার চামচ দিয়ে আলতোভাবে ভাত ঝরঝরে করে নিতে পারেন। এতে দানা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও কমে।
তবে ভাত দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া ঠিক নয়। পরে খাওয়ার জন্য সংরক্ষণ করতে হলে দ্রুত ঠান্ডা করে নিরাপদভাবে ফ্রিজে রাখতে হবে।
ভাত রান্নায় চালের ধরন বুঝে পানি ব্যবহার, উপযুক্ত আঁচ বজায় রাখা এবং রান্না শেষে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখার মতো ছোট অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে খেয়াল রাখলে ভাতের দানা, নরমভাব ও গঠন নিজের পছন্দ অনুযায়ী রাখা সহজ হতে পারে।



